শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ০৫:৪৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়োগের দাবীতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন প্রফেসর নাসিম উদ্দিন মালিথা স্মরণে শাহজাদপুরে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত সিরাজগঞ্জে সিআইজি ও ননসিআইজি খামারী সমাবেশ কাজিপুরে মা ইলিশ মাছ ধরার অপরাধে তিন জনকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজিপুরের মেঘাইঘাট ও পর্যটন কেন্দ্রের পাশ থেকে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনের কারনে চার জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা আধুনিক ও নিরাপদ শহর গড়ে তুলবো – সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী গোলাম কবির সিংড়ায় এক ভ্যান চালকের লাশ উদ্ধার সিংড়ায় ধর্ষন চেষ্টার অভিযোগে ১ জন আটক সিরাজগঞ্জে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বিয়ের ৩দিনের মাথায় স্বামীকে হাত পা বেঁধে কুপিয়ে জখম করেন নববধূ অসহায়ের কান্না কি শুনতে পান?
কেমন আছে রাক্ষুসি যমুনা চরের মানুষ

কেমন আছে রাক্ষুসি যমুনা চরের মানুষ

হান্নান মোরশেদ (রতন) চৌহালী থেকে:

 

কেমন আছে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ভাটি এলাকার ৭ নং বাঘুটিয়া ইউনিয়নের চরাঞ্চলের মানুষ । বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ঘুশুরিয়া, উত্তর হাটাইল, দক্ষিণ হাটাইলের ৪ শতাধিক পরিবারের বসবাস। বর্তমান বৈশ্বিক মহামারী কোভিট-১৯ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে কর্মহীন চরবাসী ও ঐতিহাসিক বন্যার ভয়ানক পরিস্থিতি সাথে প্রবল নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বসতভিটা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
বন্যার পানি ও প্রবল স্রোতে এবছর ঘুশুরিয়া গ্রামের প্রায় ৭০ হতে ৭৫ টি বাড়ি, উত্তর হাটাইলের ৮৫ থেকে ৯০ টি বাড়ি এবং দক্ষিণ হাটাইলের ২০ থেকে ২৫ টি বাড়ি নদী গর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে এবং ভাঙ্গন পরিস্থিতি মারাত্মক আকার দেখে প্রায় ৫০ টি বাড়ির ঘরের চাল নামিয়ে নিরাপদ ও উঁচু বসতভিটায় সরিয়ে রাখতে হয়েছে। আর ভেঙ্গে যাওয়া বসতভিটার সব ঘর বা আসবাবপত্র, গাছ – গাছালি সড়াতে না পারলেও যৎসামান্য কিছু মালামাল উদ্ধার করে পাড়ি জমাতে হয়েছে অজানা ঠিকানায়। বেশিরভাগ বাড়িগুলোই ভেঙ্গেছে গভীর রাতে । উক্ত সময়ে মালামাল পরিবহনের ইঞ্জিনচালিত শ্যালো নৌকা অত্র এলাকার ক্বোরবানীর গরু -বাছুর বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন গরু বেচাকেনার হাটে চলে যাওয়ায় ভাঙ্গনকবলিত বাড়ির মালামাল সড়াতে ব্যর্থ হয়ে নদীর পেটে সমর্পণ করতে হয়েছে । যখন কারো পাশে কেউ এসে উদ্ধারকাজে দাঁড়াতে পারেনি। আর এজন্য যথাসময়ে ঘর, আসবাবপত্র সরিয়ে নিতে পারেনি । রাক্ষুসী নদীর হিংস্র ছোবলে হারিয়ে গেছে তাদের শেষ সম্বলটুকুও। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ টি বাড়ির কোন মালামাল সড়াতে সক্ষম হয়নি। কোনরকম ঘর থেকে দ্রুত বের হয়ে জান নিয়ে সড়তে পেরেছে। অনেক গবাদি প্রাণিগুলোও গভীর রাতে তলিয়ে গিয়েছে। সব হারিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে গেছে। কতটা অসহায় ও মানবেতর জীবন যাপন করছে এই এলাকার ভুক্তভোগী মানুষেরা তা নিজ চোখে না দেখলে বুঝা যাবেনা আসলে কি ভয়ানক তান্ডব ঘটে গেছে এই এলাকার জনগনের জানমালের উপর দিয়ে। চরে বসবাসকারী মানুষের পাশে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উল্লেখযোগ্য কেউ শান্তনা দেয়ার জন্যও আসেনি। একেতো দীর্ঘ সময়ের বন্যা, বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ করোনা সংক্রমণ ও বেকারত্ব, ফসলী জমি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। দু’বেলা দু’মুঠো রান্না করে খাওয়ার মত অবস্থা যেখানে অপ্রতুল, বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এই চরবাসীর নিদারুণ অবস্থার কথা প্রকাশিত হওয়ার পরেও কর্তৃপক্ষের আশানুরূপ সাড়া মেলেনি দেখে এলাকাবাসী বিস্ময় প্রকাশ করেছে ! যৎসামান্য ত্রান তাওবা এসেছে তা ছিল প্রয়োজনীয়তার তুলনায় খুবই সামান্য। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে দরকার খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও বিনোদন। এই মৌলিক অধিকার প্রতিটি মানুষের নাগরিক অধিকার । আর এই অধিকার নিশ্চিত করতে প্রথমেই প্রয়োজন সুশাসন। যার পর্যাপ্ত ঘাটতি রয়েছে এই এলাকায়। তাই অধিকার বঞ্চিত মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাঘবের জন্য যুগান্তকারী প্রয়োজনীয় যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহনকরতঃ চর এলাকাকে প্রচুর সম্ভাবনাময় উৎপাদন জোন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সঠিক পরিকল্পনা করে শুস্ক মৌসুমে শত শত হেক্টর অনাবাদি জমিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি পণ্য উৎপাদনের পরিবেশ তৈরি, গৃহহীণদের পূণর্বাসন, কৃষি ভর্তুকি প্রদান করে ও বিভিন্ন আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ড ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা করা অতীব জরুরী। ভেঙ্গে পড়া অর্থনৈতিক মেরুদন্ডকে সোজা করে দাড় করাতে চাইলে সরকারি, বে-সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কোন বিকল্প নেই। সরেজমিনে চরবাসীর মানবেতর জীবনযাপন দেখতে গিয়ে ৮৫ বছরী এক বৃদ্ধা মায়ের সাথে কথা হল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই বৃদ্ধ মায়ের অশ্রুসিক্ত নয়নে তার ভাষ্যমতে
বাবা, যে বয়সে লাতী- লাতনীকে আমাগরে পুরান যুগের সুখ-দুঃখের গপ্প কওয়ার কতা, কওয়ার কতা গন্ডগোলের বছ্ছরের প্রত্যেকটা সময়কার ভয়- ভীতির পরিস্থিতির গপ্প, পাক বাহিনীর অত্যাচারে এক এলাকাত্থা অন্য এলাকায় পলাইন্যার কতা, ইবাদত বন্দেগী কইরা সময় কাটার কতা অথচ বয়সের ভারে যখন আর চলতে ফিরতে পারিন্যা তখনও বার বার নদীতে বাড়ি ঘর ভাসায়্যা দিতে অয়! আমরা ক্যামনে বাচমু? জীবনে সুখের মুখ দেইকপার পারল্যামনা। কেওইল আমাগ্যারে খবর নিব্যার লাইগ্যাও আইসলোনা। আমরা কি মানুষ না! এদ্যাশের সরকারের কাছে কি আমাগোরে কোনো দামই নাইক্যা? একজনের ভিট্যায় এই এ্যাঙ্গা দিয়ে খায়্যা না খায়্যা পইড়্যা আছি। কি করমু , কি খামু তা একমাত্র আল্লাই জানে।” বৃদ্ধ মা আর কোন কথাই বলতে পারেনি। তার কান্না জড়িত কন্ঠে এই কথা গুলো শোনার পর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। এরকম শত শত মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ আর ভিটে মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার কথা শুনে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটা খুবই স্বাভাবিক। একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকদের মনের কথাগুলো প্রকাশ করার জায়গা না থাকলে সেটা বড়ই পরিতাপের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
সর্বোপরি, গ্রামগুলো ঘুরে ঘুরে যা দেখলাম ও শুনলাম তা লিখে প্রকাশ করার মত ভাষা জ্ঞান যদিও আমার নাই তথাপিও কোন পাষন্ড হৃদয়ে আমার এই লেখনী যদি কিঞ্চিৎ পরিমানেও নাড়া দেয় তাহলে আমার এই শ্রম স্বার্থক হয়েছে বলে মনকে প্রবোধ দিতে পারব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved
Design & Developed BY RSK HOST